ঢাকা-ইসলামাবাদের শান্ত কূটনীতি

দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যখন ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে তখন পুরনো শত্রু পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ কাছাকাছি হচ্ছে। তারা তাদের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসছে। তারা সম্পর্ক জোরদার করার দিকে যাচ্ছে ।

ইসলামাবাদ এবং ঢাকার কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ধারাটি যদি বেগবান হয়, তাহলে তা কয়েক দশকের বিদ্যমান ‘ঐতিহাসিক অ্যারেঞ্জমেন্ট’ এর অবসান ঘটাতে পারে।

আরব নিউজ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে, যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান -বাংলাদেশ সমীকরণের দীর্ঘ ডামাডোলপূর্ণ সম্পর্কের একটা অবসানের ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশি কাউন্টারপার্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চলতি বছরের গোড়ায় অনুষ্ঠিত ওই টেলিফোন কলকে একটা বিরল ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে।

ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তান হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের পরেই ওই ফোন কলটি হয়।

১৯৭১ সালের পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক হয়নি । ৭১ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। আর তাতে সহায়তা দিয়েছিল ভারত।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একেবারেই তলানীতে গিয়ে পৌঁছায়, যখন ২০১৬ সালে ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করে । পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সেই কারণে ফাঁসি দেয়ার পুরো ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে ঘোষণা করে । পাকিস্তানের যুক্তি হচ্ছে, তারা আসলে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করার কারণেই তাদেরকে ফাঁসি দেয়।

কিন্তু এখন উভয় দেশের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেয়ার জন্য এখনই উপযুক্ত সময়।

গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আয়েশা ফারুকী আরব নিউজকে বলেছেন, বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আমরা একটি সংলাপের দিকে তাকিয়ে আছি। কি করে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারি । আমরা আশা করি যে এই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে । এবং আমাদের সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে যাবে । সেটা বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যেকোন বিষয়ে হতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশনারের বৈঠকে কি কি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত উল্লেখ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান ।

তবে বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত (ডেসিগনেট) সিদ্দিকী আরব নিউজকে বলেছেন, তাদের মধ্যকার বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো সম্পর্কের আরো উন্নয়ন ঘটানো এবং তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া। তার কথায়, উভয়পক্ষই শক্তিশালী বন্ধন চান। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে চান এবং বিশেষ করে দুই দেশের বেসরকারিখাতের অংশীদারিত্বের দিকে তারা মনোযোগ দিতে আগ্রহী।

জনাব সিদ্দিকী আরও উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের নতুন প্রজন্ম অর্থপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী । কারণ তারা জানেন যে উভয় দেশের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।

পাকিস্তানে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ রুহুল আলম সিদ্দিকী আরও উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের বেসরকারি খাতের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং এই সম্ভাবনাকে আরো জোরদার করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একত্রে কাজ করতে পারে।

সিদ্দিকী আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি পাকিস্তানে তার অবস্থানকালে দু’দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্পর্কের উন্নয়নে বিশেষভাবে সচেষ্ট হবেন। জনাব সিদ্দিকীর ভাষায়, আমার মিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে, যতটা সম্ভব দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো এবং তিনি প্রথমেই যে দিকে বিশেষ দিবেন সেটা হচ্ছে ,দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা ।

পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ২০১৯ সালে ছিল ৭৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার । বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তাদের সম্পর্কের এই সূচনা ঘটাচ্ছে এমন একটা সময়ে, যখন এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ব্যবধান বাড়ছে।

গত মাসে ভারতীয় সামরিক বাহিনী বলেছে , হাতাহাতি যুদ্ধে চীনা সৈন্যরা একটি বিতর্কিত সীমান্ত এলাকার সংঘাতে তাদের অন্তত কুড়ি জনকে হত্যা করেছে।

ভারত বর্তমানে কমবর্ধমান হারে নেপালের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে । এই এলাকার পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৩৭২ বর্গকিলোমিটার ।
এই জায়গাটি নেপাল, ভারত এবং চীনের তিব্বত অঞ্চল সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকে ভারত এই এলাকায় তার নিরাপত্তা উপস্থিতি বজায় রাখছে। কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ চলমান রয়েছে। তারা কাশ্মীরের সম্পূর্ণটা এবং অঞ্চলটি শাসনের অধিকার দাবি করে আসছে।

জনাব ফারুকী বলেছেন, আমরা দেখছি যে চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে নানা সমস্যা রয়েছে । সমস্যা রয়েছে নেপালের সঙ্গে । কিছু সমস্যা রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে । আর জম্মু এবং কাশ্মীর নিয়ে সমস্যা রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে । এসব কথা উল্লেখ করে ফারুকী বলেন, এসব নীতির কারণে ভারতের পক্ষে এই অঞ্চলের শান্তি এবং স্থিতিশীলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ময়ীদ ইউসুফ পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন বাতাবরণের প্রেক্ষাপটে আরব নিউজের কাছে আঞ্চলিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তিনি অবশ্য ভারতের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ওই পটভূমিতেই ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছে, সেটা খুবই স্পষ্ট । এই অঞ্চলের একটি মাত্র দেশ, যারা হুমকি দিচ্ছে । অসন্তোষ সৃষ্টি করছে । এবং তার সকল প্রতিবেশীর বিরক্তির উদ্রেক করছে ।
আরব নিউজের একটি ই-মেইল এর উত্তরে ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনের একজন মুখপাত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ’ এবং তা ঐতিহাসিক।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, চলতি বছরে উভয় দেশ এই অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামাবাদকে অবশ্যই ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস’ করার এই প্রচেষ্টাকে চালিয়ে নিতে হবে । যদিও বর্তমানে এটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে । অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ । তার মতে পাকিস্তানের দায়িত্বশীল ভূমিকা হবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃনির্মাণ করে নেয়া।

ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার আব্দুল বাসিত বলেছেন, ইমরান খান বাংলাদেশকে যে টেলিফোন করেছেন সেটির এখন উচিত হবে ফলোআপ করা ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উচিত হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানানো। সেকারণে একটা আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেয়া এবং এরকমের আমন্ত্রণ পত্রের মধ্য দিয়েই এই সফরের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে । তিনি আরো পরামর্শ দেন ঢাকার জন্য একজন বিশেষ রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা উচিত, যেটা কাবুলের ক্ষেত্রে সম্প্রতি করা হয়েছে । তার কথায় পর্দার আড়ালে বেশি কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্য মনোযোগ দিতে হবে । অপ্রয়োজনীয় আবেগের জায়গা তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে । আর এই প্রক্রিয়া হতে হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *